এর পরই রয়েছে দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য; রফতানি বাজারে যার হিস্যা মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। এর বাইরে অন্যান্য প্রধান রফতানি পণ্যের অবদান ২ শতাংশেরও কম।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রফতানি খাতে প্রতিযোগী দেশগুলো প্রতিনিয়ত পণ্য বৈচিত্র্যায়ণের দিকে ঝুঁকছে। বিপরীতে বাংলাদেশ এখনো একটি খাতের ওপরই নির্ভরশীল। ফলে এ খাতে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে তা দেশের পুরো রফতানি আয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা কাটিয়ে পণ্য বৈচিত্র্যায়ণের দিকে নজর দিতে হবে। এছাড়া যেসব পণ্য এরই মধ্যে রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, সেগুলোর সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ প্রায় ৫ লাখ ৮৩ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকার পণ্য রফতানি করেছে। এর মধ্যে শুধু নিটওয়্যার ও ওভেন গার্মেন্টস পণ্য তথা পোশাক খাতের আয় ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৩১২ কোটি টাকা; যা মোট রফতানি আয়ের ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ ও রফতানিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ একমুখী নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করছে। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা, বাণিজ্যনীতি বা ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে পোশাক খাতে ধাক্কা এলে দেশের সামগ্রিক রফতানি আয় বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কারোপসহ নানা কারণে দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হয়েছে। এছাড়া বৈশ্বিক মন্দা, মহামারী বা সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্নতার কারণেও পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তারা বলছেন, ভিয়েতনাম, চীন ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো এরই মধ্যে ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি, উচ্চমূল্যের টেক্সটাইল এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্যে বিনিয়োগ বাড়িয়ে রফতানি পণ্যের পরিধি বিস্তৃত করেছে। ফলে তারা বৈশ্বিক বাজারে বহুমুখী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশল গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
দেশের রফতানি আয়ে পোশাক খাতের পরই রয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। রফতানির বাজারে মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ হিস্যা নিয়ে এ খাতটি দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও এর প্রবৃদ্ধিতে খুব একটা তারতম্য হয়নি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি থেকে এসেছে ১২৩ কোটি ডলার। প্রায় আট বছর পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাত থেকে রফতানি আয় হয়েছে ১৩ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বা ১১৩ কোটি ডলার (ডলারপ্রতি ১২২ টাকা হিসাবে)।
রফতানি আয়ে তৃতীয় অবস্থানে থাকা পাট ও পাটজাত পণ্যের অবদান মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ, টাকার অংকে যার পরিমাণ ১০ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা। এছাড়া হোম টেক্সটাইলে ৯ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা (১ দশমিক ৬ শতাংশ) এবং তুলা ও তুলাজাত পণ্য থেকে আয় হয়েছে ৬ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা (১ দশমিক ১ শতাংশ)।
জুতা ও প্রকৌশল খাত থেকে রফতানি আয়ের অবদান ছিল ১ দশমিক ১ শতাংশ করে। এছাড়া রাসায়নিক পণ্য, বিশেষায়িত বস্ত্র, চিংড়ি, প্লাস্টিক পণ্য ও তামাক পণ্য থেকে হয়েছে দশমিক ৮ থেকে দশমিক ৫ শতাংশ করে রফতানি আয়। আর অন্যান্য খাত থেকে আয় হয়েছে ৬ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ শিল্প, আইসিটি সেবা, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক পণ্য এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য। এসব খাতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। এছাড়া রফতানি বহুমুখীকরণের পথে প্রধান বাধা হিসেবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জটিল নীতিমালা, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং আর্থিক সহায়তার ঘাটতির কথা উল্লেখ করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, বন্দর ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ, স্বল্প সুদে ঋণ এবং কর-সুবিধা বৃদ্ধি করা গেলে এসব খাত দ্রুত বিকশিত হতে পারে।
দেশের অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতকরণে রফতানি বৈচিত্র্যায়ণের বিকল্প নেই বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
তারা বলছেন, ‘টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে রফতানি ঝুঁকি কমানো জরুরি। সে ক্ষেত্রে একক খাতনির্ভরতা থেকে বের হয়ে বহুমুখী রফতানি কাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই। তৈরি পোশাক খাত দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে থাকলেও এর পাশাপাশি অন্যান্য খাতকে শক্তিশালী করতে না পারলে ভবিষ্যতে রফতানি আয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। তাই এখন থেকেই পরিকল্পিতভাবে পণ্য বৈচিত্র্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া সময়ের দাবি।’